Breaking News

Agriculture project

||নির্ভেজাল কৃষি সমৃদ্ধ সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশ গড়ি||

'খাঁটি সোনার চাইতে খাঁটি আমার দেশের মাটি-পানি-বায়ু। গ্রাম-বাংলার মাটির বুকে অপরূপ সবুজ আভা আমাদের মন জুড়িয়ে দেয়। এ এমনি এক দেশ যেখানে সমুদ্র, নদী, পাহাড়-পর্বত, টিলা, সমতল ভূমি, বন, পাখ-পাখালী, হাওর-বাওর, বিলের এক অপূর্ব মিলন মেলার সমাহার। এখানে পাহাড়ে, নদীতে, বিলে, হাওরে, ভূমিতে সর্বত্রই সোনা ফলে। আপনার হাতকে আপনার করে হৃদয়ের অকৃত্রিম ছোঁয়ায় সবই সম্ভব হয় ও হয়েছে বা হচ্ছে। এই ক্ষুদ্র দেশে আয়তনের তুলনায় মানুষ দিন দিন হুহু করে বাড়ছে। ফলে কমছে ভূমি। উজাড় হচ্ছে বন। নদী তাঁর প্রবাহ হারাচ্ছে। হাওর-বাওর-বিলে প্রকৃতির ছোঁয়া লোপ পাচ্ছে। হচ্ছে কৃত্রিমের আবাদ, উঠছে দালান-কোঠা।

মানবসম্পদ বৃদ্ধির সাথে প্রয়োজন হচ্ছে অধিক খাদ্য সরবরাহ। ফলে খাদ্য-দ্রব্যে যুক্ত হয়েছে হাইব্রিড শব্দ। যত্রতত্রই হাইব্রিড শুনতে শুনতে ক্লান্ত। হাইব্রিড স্বাদ ও নরমালের স্বাদ সত্যি ভিন্নতায় পূর্ণ। হাইব্রিড স্বাস্থ্যের জন্য সুখকর নয়। দীর্ঘমেয়াদে এর কুফল ধরা পড়ে। এজন্য বর্তমানে বিশেষজ্ঞরা জৈব উপাদানে চাষাবাদে গুরুত্বারোপ করছেন। রাসায়নিক উপাদানে উৎপাদিত হাইব্রিড দ্রব্য কখনও ভাল কিছু উপহার দিতে পারে না। আমরা যদি একটু অতি মুনাফার আশা থেকে নিজেদেরকে সরিয়ে নিয়ে জৈব উপাদান সমৃদ্ধ সার-কীটনাশক ব্যবহার করি তাহলে আমরা ফিরে পাব আমাদের পূর্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। যা আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা করতেন। তখন কি কোন হাইব্রিড ছিল? কিন্তু তাঁরা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন, দীর্ঘসময় রোগমুক্ত ছিলেন। আমরা যারা শহরের যান্ত্রিক পরিবেশে দিনযাপন করছি তারা হাইব্রিড-অর্গানিক কোনটা কি বাদ-বিচার করার সময় পাই না। কিন্তু এখন সময় হয়েছে এগুলি বাদ-বিচার করে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য অর্গানিক খাদ্য দ্রব্যের। আমরা যদি একটু সচেতন হই তাহলে আমরা অর্গানিক উপায়েই সার উৎপাদন, পোকা-মাকড় দমন করতে পারি।

সার হিসাবে জৈব সবুজ সার, কেঁচো/ভার্মি/কুইক/ডি-কম্পোস্ট, গোবরটি, বোকাশি, গোবর, মুরগীর বিষ্ঠা, পশুর রক্ত-হাঁড়, ডিমের খোসা, পঞ্চগব্য, দশগব্য ইত্যাদি। কীটনাশক হিসাবে পঞ্চগব্য, দশগব্য, আতাফলের বীজ-পাতা, মেহগনির বীজ, বাসক পাতা, বিষকাটালীর রস, জাম পাতা-বীজ, টমেটো পাতা, নিম পাতা-বীজ, নিশিন্দা পাতা, তুলসী পাতা, তামাকপাতা, জবাফুল, কেরোসিন, জৈব পেস্ট কন্ট্রোল, আলোকফাঁদ ইত্যাদির ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে জৈব কৃষি উপাদানে আমাদের সোনার মাটি তার প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ফিরে পেয়ে অধিক উৎপাদনে ধাবিত হবে। ইনশাআল্লাহ॥

ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিলের জন্য আজকাল প্রায়ই যত্রতত্র শুনছি অর্গানিক শব্দের ব্যবহার। কিন্তু অর্গানিক বা জৈব কথাটি বলার পূর্বে আমরা কি ভাবছি আমার পণ্যটি সম্পূর্ণ জৈব উপাদান সমৃদ্ধ কি না। আমার পণ্যটি যদি সত্যিই অর্গানিক হয়ে থাকে তবে মাটি থেকে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যন্ত এর জৈব গুণগতমান পর্যবেক্ষন বজায় রেখেছি কি?

বর্তমানে একটি কৃষি জমিকে জৈব উপাদানে সমৃদ্ধ করতে হলে নূন্যতম ৩-৪ বছরের প্রয়োজন হয়। এমনকি কয়েক বৎসর ঐ জমিটি সম্পূর্ণ সকলপ্রকার চাষমুক্ত খোলা মাঠ হিসেবে রাখতে হয়। কারণ ঐ জমিগুলিতে দীর্ঘকাল যাবৎ রাসায়নিক সার ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এজন্য জমিতে রাসায়নিক সার না দিলেই পণ্যটি যে সাথে সাথে শতভাগ অর্গানিক পণ্য হবে এটা বলা যাবে না। অর্গানিক পণ্য উৎপাদনে রাসায়নিক সংমিশ্রণ কাম্য নয়। এজন্য ধারাবাহিক ভাবে সেমি অর্গানিক ও পরবর্তীতে সম্পূর্ণ অর্গানিকে যাওয়া যাবে।

জৈব উপাদান নির্ভরমূলক উৎপাদনে গেলে রাসায়নিকের চেয়েও ভাল উৎপাদন নিশ্চিত করা যাবে। প্রয়োজন হবে সততা, সময়, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সংমিশ্রণ।
প্রয়োজনের তাগিদেই জৈব পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। আমাদের এ সোনার দেশের বায়ু-মাটি সব ফসলের চাষের জন্য উপযুক্ত। এখন দেশী-বিদেশী বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন হচ্ছে আমাদের সোনার মাটিতে।

আমরা অনেকেই বিদেশী ফলের কদর করি এবং তা অধিক মূল্যের বিনিময়ে তার স্বাদ গ্রহনের চেষ্টা করি। কিন্তু আমরা সবাই যদি একটু সচেতন হই তবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে দেশী-বিদেশী ফল-সব্জীর চাষ করে অধিক মুনাফা গ্রহনেরও সুযোগ তৈরি করতে পারি সাথে নিশ্চিত করতে পারি কম মূল্যে দেশে উৎপাদিত বিদেশী পণ্য।

বিদেশী ফল যেমন- স্ট্রবেরী, ড্রাগন, স্টার আপেল, মালটা, আঙ্গুর, কমলা, এভোক্যাডো, পীচ, প্যাশন. নাগলিঙ্গম, রাম্বুটান, সৌদি খেজুর, ট্যাং, চায়না লকট, থাই লকট, পার্সিমন, জাবাটি কাবা ইত্যাদি নানান জাতের নাম না জানা বিদেশী ফল এখন দেশেই উৎপাদন হচ্ছে।

বিদেশী সব্জী যেমন- এ্যাসপারাগাছ, ক্যাপসিকাম, ব্রুকলি, চেরি টমেটো, লেটুস পাতা, রেড কেবিচ, মাশরুম, সৌদী কোচা, থাই আদা, কারিপাতা, টমাটিলো ইত্যাদি নানান জাতের নাম না জানা বিদেশী সব্জী এখন দেশেই উৎপাদন হচ্ছে।

সাথে সাথে দেশী শাক-সব্জী, ফল ইত্যাদি উৎপাদন তো হচ্ছেই। যদি আমরা অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে দেশী সব্জী-ফলের সাথে বিদেশী ফল-সব্জীগুলি রপ্তানী করতে পারি তবে বৈদেশীক মুদ্রাও অর্জন করা সম্ভব। ভবিষ্যতে ভার্টিকাল ফার্মিং বা উলম্ব খামার অর্থাৎ ঘরের ভিতরে বহুতল বিশিষ্ট তাক তৈরীর মাধ্যমে ফসলাদি উৎপাদন জনপ্রিয়তা লাভ করবে।

আর সমুদ্র-নদী, হাওর-বাওর, খাল-বিল, পুকুর-জলাশয় বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন প্রজাতীর মাছ, কুঁচিয়া, কাঁকড়া, কচ্ছপ, শামুক, ঝিনুক, ব্যাং, মুক্তা, পাতিহাঁস, রাজহাঁস ইত্যাদি চাষের এক অফুরন্ত দুয়ার। বর্তমানে ইনডোর ফিস ফার্মিং (IRAS/RAS) জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এ পদ্ধতিতে বর্তমান উম্মুক্ত জলাশয়ের একই পরিমাণ জায়গার থেকে ১০-২৫গুণ উৎপাদন সম্ভব। সম্পূর্ণ ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম। একটি মাছ ক্ষতি হলেও তা উপলব্ধিযুক্ত। এছাড়াও গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, উট, লামা, হাঁস-মুরগী ইত্যাদিও লালন-পালনও হতে পারে আয়ের মাধ্যম।

আমার দেশের প্রকৃতি পরিবেশ পাখা-পাখালী পালনেও উত্তম। এখন দেশী-বিদেশী পাখ-পাখালীও পালন হয়ে আসছে। শৌখিন ও বাণিজ্যিক দু’ভাবেই এ পেশায় অনেক ভ্রাতা জড়িত। পাখ-পাখালির মধ্যে যেমন- কোয়েল, তিতির, টার্কি, কবুতর, লাভবার্ড, ককাটেল, লংটেল, ফিন্স, ডায়মন্ড ডোব, অস্ট্রেলিয়ান বার্ড, বিদেশী জাতের ঘুঘু, বাজরিগার, ময়ূর ইতাদি পালন এক বড় আকারের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতিকৃতি।
আমাদের মাটি-পানি-আবহাওয়া বন্য প্রাণী পালনেও অগ্রগণ্য। হরিণ, কুমির, সাপ, উটপাখি, এমু ইত্যাদি পালনের উপযোগী পরিবেশ বিদ্যমান। সরকারী সহযোগীতা পেলে এখাতগুলি হতে প্রচুর বৈদেশীক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

এদেশের প্রকৃতি ও পরিবেশের কারণে পর্যটন খাতও উচ্চতার ছোঁয়া সমৃদ্ধ। সরকারী নিবিড় নিরাপত্তা ও সহযোগীতায় এবং বেসরকারী উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান এবং নতুন স্পট তৈরী করনের মাধ্যমেও এখাত হতে প্রচুর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব।

এখন আধুনিক থেকে আধুনিকতার যুগ। নিত্য নতুন পদ্ধতি আবিস্কার হচ্ছে। আগে কৃষকরা শুধু মাঠে ও কর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন মিডিয়া ও ইলোকট্রনিক মাধ্যমে আমরা ডিজিটালাইজড হওয়ার চেষ্টায় আছি। এখানে প্রকৃত চাষীর চেয়ে ডিজিটাল চাষীর সংখ্যা বেশী। শুধু ডিজিটাল চাষী না হয়ে প্রকৃত জ্ঞানের প্রয়োগ ঘটিয়ে মাঠের কর্মঠ প্রকৃত চাষী হলেই কেবল সফলতা আনয়ন করা সম্ভব হবে।

আমাদের দেশে বেশীরভাগক্ষেত্রে পারিবারিকভাবে কিন্তু ব্যবসা করতে উৎসাহ দেয়া হয় না। আর কৃষিকে তো একেবারে না। তথাপিও কৃষি ব্যবসার সাথে লক্ষ-লক্ষ মানুষ জড়িত। এখানে পারিবারিকভাবে চাকরী করতে উৎসাহ দেয়া হয় এবং এটাকে একটা নিরাপদ জীবন মনে করা হয়। যাদের ব্যবসা করার সামর্থ, অদম্য ইচ্ছা শক্তি আছে তাদেরকেও দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। তারপরও অনেকের অদম্য ইচ্ছা শক্তির প্রভাবে উদ্যোক্তা’র সৃষ্টি হয়।

একজন উদ্যোক্তা’র দৃষ্টিভঙ্গি এবং একজন চাকরিজীবির দৃষ্টিভঙ্গি কখনও এক হতে পারে না। আমরা যারা উদ্যোক্তা হওয়ার বাসনায় রত তাঁরা আগে আমার নিজ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে নিজের লক্ষ নির্ধারণ করি তারপর যথাযথ জ্ঞান নিয়ে তা মাঠ পর্যায়ে ধীরে ধীরে বৃহত্তর যাত্রায় বাস্তবায়নের চেষ্টা করি সার্বিক সফলতার জন্য। এখানে কারও চাপিয়ে দেয়া বা কারও পরামর্শমত হুবুহু মুখস্থ কর্মসিদ্ধ না করি। সবসময় নিজের মতামতের বিষয়টির উপর আস্থা রাখি। আস্থার আস্থাহীনতা ঘটলে পদস্খলন বাঞ্ছনীয়, প্রদীপ নিভে গেলে যেমন অন্ধকার।

যারা কৃষি নিয়ে কিছু ভাবি কিন্তু বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার তাগিদে একক চেষ্টায় না হয়ে ওঠার কারণে আমরা ইলোকট্রিনিক মিডিয়ার মাধ্যমে অনেকে একত্রে হওয়ার স্বপ্ন দেখি এবং সম্মিলিতভাবে পুঁজি গঠনের মাধ্যমে কিছু করার স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখা ভাল। কৃষি একটি ঝুঁকি যুক্ত ক্ষেত্র। এখানে অবলা-বাক্যহীনদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করে কর্মসিদ্ধ করতে হয় এবং এটিতে স্বল্পমেয়াদে উচ্চতর বেনিফেটেড হওয়া যেমন দুষ্কর তেমনি একটু ভুল হলে মূলধন টিকিয়ে রাখাও দুষ্কর। এজন্য এ পেশায় বিনিয়োগের পূর্বে নির্ধারিত প্রকল্পের নিশ্চিত মূলধন বজায় রাখার জন্য কি কি পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করি। আর সাথে সাথে কারও সাথে যৌথভাবে কাজ করতে হলে তাঁর আইনগত সুবিধা-অসুবিধাগুলিও খতিয়ে দেখে একত্র হওয়ার চেষ্টা করি। আমরা কেউই চাইব না আমার কষ্টার্জিত অর্থ কোন অবস্থাতেই শূন্যতার অংকে পর্যবসিত হউক।

যে সকল ভাইয়েরা বিদেশে অবস্থান করেন এবং যে সকল ভাইয়েরা অতি উচ্ছ্বাশা নিয়ে কৃষি পেশায় আসতে চান তাদেরকে বলব, সৌখিনতায় শুরু করুন আপনার অতি আপনজনের বা নিজ অবস্থানের মাধ্যমে খুবই স্বল্প পরিসরে, পরে ১-২বছর পরে আপনার অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে আপনার খামার বৃহত্তর পরিসরে সাজান। কৃষি কোন স্বল্পমেয়াদে মুনাফার ক্ষেত্র নয়। দীর্ঘমেয়াদী যাত্রায় প্রচুর ধৈর্য ও অর্থব্যয়ের প্রশ্ন জড়িত। আপনি অসুস্থ হলে বলতে পারেন আপনার কোথায় সমস্যা কিন্তু ঐ অবলা প্রাণী’র বাহ্যিক আচারণ, চেহারা, মল-মূত্র ইত্যাদি দেখে, পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তার কি হয়েছে; কেননা সে তো অবলা। অনেক সময় দেখা যায় কোন কিছু বুঝে উঠার পূর্বেই সাথে-সাথেই সবই শেষ। তাই এ পেশায় আসার পূর্বে প্রচুর অধ্যায়ন করুন এ বিষয়ে। এপেশায় নিয়োজিত বিভিন্নজনের সাথে পরামর্শ করুন। আপনার নিকট বর্তী পশু চিকিৎসক, মৎস্য কর্মকর্তা, কৃষি কর্মকর্তা’র সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখুন এবং হাতুড়ি চিকিৎসক থেকে সর্বদা দূরে থাকুন।

তাই আসুন, সঠিকতা ও প্রকৃত জ্ঞানের মাধ্যমে আমাদের মাতৃভূমির মাটি-পানি-বায়ুকে কাজে লাগিয়ে অবলা-বাক্যহীনদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন পূর্বক এক নির্ভেজাল কৃষি সমৃদ্ধ সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশ গড়ে তুলি।

No comments